ইসলামে পারস্পরিক সহযোগিতা

0
15

ক্রাইম অনুসন্ধান ডেস্ক: অসংখ্য হাদিসে নববি মুসলিম সমাজের তাকাফুল বা পারস্পরিক সহযোগিতার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে এবং এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ইসলামে এর গুরুত্ব কতটুকু, সে ব্যাপারে একটি হাদিস, আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী করিম (সা.) বলেন ‘আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা মদিনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার কমে যায়, তখন তারা তাদের যা কিছু সম্বল থাকে তা একটা কাপড়ে জমা করে। তারপর একটা পাত্র দিয়ে মেপে তা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। কাজেই তারা আমার এবং আমি তাদের।’ (বোখারি : ২৩৫৪; মুসলিম : ২৫০০)

ইসলামি শরিয়ত তার মুসলিম অনুসারীদের ওপর আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সাহায্য-সমর্থন আবশ্যক করে দিয়েছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন ও বৈষয়িক ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা তো বলাই বাহুল্য। এ কারণে দ্বীনের কল্যাণে তারা একটি মজবুত অট্টালিকার মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে। আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন ‘একজন মোমিন অপর মোমিনের জন্য গৃহ-কাঠামোর মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে সুদৃঢ় রাখে। তারপর তিনি এক হাতের আঙুলগুলো অপর হাতের আঙুলের মধ্যে প্রবেশ করালেন।’ (বোখারি : ৫৬৮০; মুসলিম : ২৫৮৫)। অথবা মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের মতো, তার এক অঙ্গ অসুস্থ হলে দেহের সব অঙ্গই জ্বর ও বিনিদ্রায় আক্রান্ত হয়। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সহানুভূতি ও দয়া-অনুগ্রহে মোমিনদের উদাহরণ হলো একটি দেহের মতো, যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন পুরো শরীর তার জন্য বিনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (বোখারি : ৫৬৬৫; মুসলিম : ৬৫)।

এ কারণে ইসলামে সামাজিক সহযোগিতা শুধু বৈষয়িক উপকারিতাতেই সীমাবদ্ধ নয়। যদিও তা ইসলামে একটি মৌলিক স্তম্ভ। বরং এ সহযোগিতা সমাজের যাবতীয় প্রয়োজনে ব্যাপ্ত; চাই তা ব্যক্তির ক্ষেত্রে হোক বা দলবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে হোক; চাই সে প্রয়োজন বৈষয়িক হোক বা মানসিক অথবা চিন্তাগত হোক। সহযোগিতার এসব ক্ষেত্র যতটা বিস্তৃত ততটাই এর অন্তর্ভুক্ত। এভাবে তা উম্মাহর অভ্যন্তরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর যাবতীয় মৌলিক অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ইসলামের সব শিক্ষাই মুসলমানদের মধ্যে সামগ্রিক অর্থে পারস্পরিক সহযোগিতাকে জোরদার করেছে। আপনি দেখবেন, ইসলামি সমাজে স্বাতন্ত্র্য, আমিত্ব ও নেতিবাচকতা বলতে কিছু নেই; বরং ইসলামি সমাজে সর্বদাই রয়েছে সততা, ভ্রাতৃত্ব, উত্তম দান এবং কল্যাণ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা।

ইসলামে সামাজিক সহযোগিতা শুধু মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে যুক্ত মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ধর্ম, গোত্র, বিশ্বাস নির্বিশেষে ইসলামি সমাজে বসবাসকারী সবার জন্য তা পরিব্যাপ্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সূরা মুমতাহিনা : ৮)।

পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি হলো মানুষের সম্মান ও মর্যাদা। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘আর নিঃসন্দেহে আমি আদম সন্তানদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদের আমি উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৭০)।

ইসলামি সমাজের সদস্যদের মধ্যে পাস্পরিক বন্ধন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে যত ব্যাপকার্থক আয়াত রয়েছে তার অন্যতম এটি ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।’ (সূরা মায়িদা : ২)।
ইমাম কুরতুবি বলেছেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার নির্দেশ সৃষ্টিজগতের সবার জন্য অর্থাৎ তাদের একে অপরকে সাহায্য করবে।’ (আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, খ. ৬, পৃ. ৪৬-৪৭)।

আল-মাওয়ারদি বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা সৎকাজে সহযোগিতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবং একে তাঁর তাকওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। কারণ তাকওয়ায় রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সৎকাজে রয়েছে মানুষের সন্তুষ্টি। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের সন্তুষ্টি একত্রে অর্জন করল তার জন্য সৌভাগ্য পূর্ণতা পেল এবং তার নেয়ামতগুলো ব্যাপক হলো।’ (আদাব আদ-দুন্য়া ওয়া আদ-দীন, পৃ. ১৯৬-১৯৭)।
কোরআনুল কারিম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ধনীদের সম্পদে মুখাপেক্ষীদের জন্য নির্ধারিত হক রয়েছে, তা তাদের দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘আর যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে ভিখারি ও বঞ্চিতের।’ (সূরা মাআরিজ : ২৪-২৫)।

শরিয়ত-প্রবর্তক নিজেই এ হকের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন; ধনাঢ্যদের বদান্যতা, অনুগ্রহকারীদের করুণা এবং তাদের অন্তরে যে দয়া, তাদের হৃদয়ে সৎকাজ ও পরোপকারের যে আগ্রহ এবং কল্যাণকর কাজের যে প্রেম রয়েছে তার জন্য তা বাদ দেননি। অর্থাৎ বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকেননি।

কারা এ হকদার মুখাপেক্ষী তাদের আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কোরআনের এ আয়াতেÑ ‘সদকা (জাকাত) তো শুধু নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ-ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। তা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তওবা : ৬০)।

এ আয়াত থেকে জাকাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। কারণ জাকাতের খাতগুলোতে সমাজের অধিকাংশ সদস্যই অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া এটি সহযোগিতা ও সাহায্য-সমর্থনের দিকটি সামলানোর জন্য প্রধান মৌলিক উৎস। জাকাত ইসলামের ফরজগুলোর মধ্যে তৃতীয় ফরজ (ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ)। কেউ জাকাত অস্বীকার করলে তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়। জাকাত তার মালিকের (প্রদানকারীর) চিত্তকে পরিচ্ছন্ন করে এবং আত্মাকে পবিত্র করে। জাকাত যাদের দেওয়া হয় তাদের উপকারের চেয়ে আদায়কারীর উপকারই আগে করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা (জাকাত) গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে।’ (সূরা তওবা : ১০৩)।

কোনো সন্দেহ নেই, জাকাত যিনি দেন তা তার অন্তর থেকে কৃপণতা, লোভ, কুক্ষিগত করে রাখার মনোভাব ইত্যাদি দূরীভূত করে দেয়। একইভাবে তা দরিদ্র, মুখাপেক্ষী ও জাকাতের হকদারের অন্তর থেকে হিংসা, বিদ্বেষ এবং ধনিকশ্রেণি ও সম্পদশালীদের প্রতি যে ঘৃণা তা দূর করে দেয়। ফলে যে সমাজে এ মহান ফরজটি আদায় করা হয়, সেখানে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা, ভালোবাসা, পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও দয়া-মততার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

শরিয়ত রাষ্ট্রপ্রধানকে ধনীদের থেকে দরিদ্রদের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। প্রত্যেকের থেকে তার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ গ্রহণ করা হবে। মুসলিম সমাজে এ ব্যাপারটি জায়েজ নেই যে, কিছু মানুষ ভরা-পেটে তৃপ্ত হয়ে রাত কাটাবে এবং তাদেরই পাশে তাদের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকবে। সামগ্রিকতার বিবেচনায় সমাজের ওপর এটা আবশ্যক যে, ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে তাদের একে অপরকে সাহায্য করবে। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘ওই লোক আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি যে পেট ভরে খেয়ে রাতযাপন করল, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত এবং সে তা জানে।’ (মুসতাদরাক : ৭৩০৭)।

ইমাম ইবনে হাজম এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘প্রত্যেক দেশের ধনীদের জন্য ফরজ (আবশ্যক) হলো দরিদ্রের (ভরণ-পোষণের) দায়িত্ব গ্রহণ করা। শাসক তাদের তা করতে বাধ্য করবেন। যদি জাকাত তাদের জন্য পর্যাপ্ত না হয়। (ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের জন্য জাকাতের বাইরেও হক রয়েছে)। তাদের জন্য আবশ্যক খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে, শীতের পোশাক এবং অনুরূপ গ্রীষ্মের পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ঝড়-বাদল, রোদ-তাপ ও যাতায়াতকারীদের দৃষ্টি থেকে হেফাজতকারী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।’ (আল-মুহাল্লা, খ. ৬, পৃ. ৪৫২)।

বৈষয়িক সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি মুখাপেক্ষীদের ন্যূনতম প্রয়োজন সুন্দরভাবে পূরণ করে দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের যথেষ্ট পরিমাণ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আমিরুল মোমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর বক্তব্য থেকে এ মর্মার্থই প্রকাশ পায়। তিনি বলেছেনÑ ‘তোমরা তাদের বারবার সদকা দাও, এমনকি তাদের একেকজন ১০০টি করে উট পেলেও।’ (প্রাগুক্ত)।

অসংখ্য হাদিসে নববি মুসলিম সমাজের তাকাফুল বা পারস্পরিক সহযোগিতার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে এবং এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ইসলামে এর গুরুত্ব কতটুকু, সে ব্যাপারে একটি হাদিস : আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী করিম (সা.) বলেন ‘আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা মদিনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার কমে যায়, তখন তারা তাদের যা কিছু সম্বল থাকে তা একটা কাপড়ে জমা করে। তারপর একটা পাত্র দিয়ে মেপে তা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। কাজেই তারা আমার এবং আমি তাদের।’ (বোখারি : ২৩৫৪; মুসলিম : ২৫০০)।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here